আসিফ ইকবাল আরিফের ছোটগল্প ‘যেখানে সবাই ছিলো নি:সঙ্গ’
২৪ অক্টোবর, ২০২০ ০৫:৩৩ অপরাহ্ন

  

আসিফ ইকবাল আরিফের ছোটগল্প ‘যেখানে সবাই ছিলো নি:সঙ্গ’

মো. ফাহাদ বিন সাঈদ, জাককানইবি প্রতিনিধি
১৭-১০-২০২০ ১১:২৪ অপরাহ্ন

আমি জানতাম একদিন সবকিছু উল্টে-পাল্টে যাবে; ফুলের রাত, জ্যোৎস্নার ছায়া, কান্নার রঙ, বৃষ্টির ঝনঝন শব্দ, কাচের দেওয়ালে লেগে থাকা বৃষ্টিফোঁটা, জোনাকের মিটিমিটি আলো, গন্ধরাজের গন্ধ, কামিনীর সৌরভ – সবকিছুই এলোমেলো হয়ে যাবে হিংসা আর বিদ্বেষের কালো থাবাতে। আমার মতো হয়তো লোকটিও জানতো সবকিছু। লোকটি আমার জীবনে তিনটি রাত দিয়েছিলো। আর সেই তিনরাতেই আমি বদলে গিয়েছিলাম। সেই তিনরাতেই আমি আমার পৃথিবীর সব নি:সঙ্গতাকে ছুটি দিয়ে ভোরের রৌদ্রের ঝাঁজে হেসেছিলাম, অলকানন্দের হলুদের মতো নিজেকে সাজিয়েছিলাম বাহারী ঢংয়ে। আমার মতো হয়তো লোকটিও তার জীবনের সঙ্গের বৃত্তে নি:সঙ্গতা ভেঙে ফেলে আবার জেগে উঠেছিলো, উৎফুল্ল হয়েছিলো হাজার রাতের নীরবতাকে পেছনে ফেলে। 

ড. সিফাত নামের যে ভদ্র লোকটি আমার জীবনের সাথে জড়িয়েছে, আমি তাকে কোনো দোষারোপ করতে চাই না। আবার তার প্রতি যে আমার কোনো প্রগাঢ়তা কাজ করে তাও কিন্তু না। লোকটি ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বয়স পয়ত্রিশ বা চল্লিশের মতো হবে। ঘরে তার স্ত্রী ছিলো। সাথে দুইটি কন্যাও। 

 

আমার বয়স ছিলো চব্বিশ বছর। তখন আমি সবে পড়াশুনা শেষ করে চাকরীর জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আগেই বলে নেওয়া ভালো যে তখনো আমি প্রেমে পড়ি নি। অনেক ছেলেই আমার পেছনে মৌমাছির মতো লেগে থাকতো, এখনো লেগে থাকে – আমার মানসিক যোগাযোগ কারোর সাথে হয় নি। আর আমি যখন নবম শ্রেনীতে পড়তাম, তখনকার একটা ঘটনা আমাকে খুব পীড়িত করেছিলো। সেই ঘটনা আমাকে এতোটাই আঘাত করেছিলো যে তারপর থেকে যতো পুরুষ দেখেছি, সবাইকেই আমি ঘৃণার চোখে দেখেছি।  এমনকি আমার বাবা, মামা, চাচা, ভাই – সবার চোখেই আমি ঐ খারাপ লোকটাকে দেখতে থাকি – যে শুধু আমার দিকে ধেয়ে আসছে তার লালসার ঘোলাজল আমার নদী বক্ষে ঢালতে। তখন থেকেই সব পুরুষের মুখ আমার কাছে গোরু-ছাগল আর মুরগীর গলাকাটা ছুরির মতো মনে হয়, পুরুষের হাতের আঙুলগুলোকে মনে হতে থাকে নেকড়ের নখ। সেকথা বাদ দেই। ওকথা আমি ভুলে গেছি, এখন আর মনে করতে চাই না। যা আমি আমার জীবনের লম্বা একটা সময় ধরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, সেটা আমি বছরখানেক আগে বিদায় দিয়েছি। ড. সিফাত আসার পরে আমি সেটা ভুলে গিয়েছি। কে ছিলেন ড. সিফাত? আমার আর তার মধ্যে কিইবা এমন হয়েছিলো – যা আমাকে বদলে দিলো? বা সে নিজেই বদলে গেলেন আমাকে বদলাতে গিয়ে? চলুন সেই গল্পটা এখন বলে ফেলি।

 

আমি আগেই বলেছি যে লোকটির সাথে আমার যখন প্রথম যোগাযোগ হয়েছিলো, তখন আমি চাকরীর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। লোকটি ভালো গল্প লিখতো - এখনো লেখেন, কবিতা লিখতো – এখনো লেখেন নিয়মিত। তার কবিতায় আর গল্পে অসম্ভব রকমের বাস্তবতা থাকতো। মাঝে মাঝে মনে হতো উনি নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়ে মনে হয় মানুষের ভেতরেই বসে থাকতেন। বসে না থাকলে এতোটা বাস্তবতার ভেতরে ঢোকা খুব কঠিন।

আমি তাকে ফেসবুকে বন্ধুত্বের প্রস্তাব দেওয়ার একঘণ্টার মধ্যেই সে আমাকে গ্রহণ করেছিলো। আমি খুব পুলকিত হয়েছিলাম। আমিও কবিতা লিখতাম; ছোটোবেলা থেকেই লিখতাম। তবে আমার কোনো কবিতার বই ছিলো না তখন। আমি বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় অনেকেগুলো কবিতা ছাপিয়েছি। আমি মাঝে মাঝে তাকে কবিতা পাঠাতাম, সেও আমাকে পাঠাতো তার কবিতা। আমি খুব সম্ভবত তার কবিতার প্রথম পাঠক ছিলাম। ভাষাগুলো খুব কাঁচা থাকতো, দু'য়েকটা বানান ভুলও থাকতো। তবে কবিতা পড়েই আমার যেটা মনে হতো তা হচ্ছে যে সে সদ্য কবিতাটি লিখেই আমাকে ইনবক্সে পাঠাতো। আমার সেসময় খুব আনন্দ লাগতো। আনন্দ লাগতো এইভেবে যে কোনো কবির সদ্য কোনো সৃষ্টির প্রথম পাঠক আমি। আমার এটা বলতে দ্বিধা নেই যে লোকটির সৃষ্টশীলতার প্রতি আমার শুধু দুর্বলতাই ছিলো না বরং আমার গভীর দুর্বলতা ছিলো। 

সে রাতে লোকটি আমাকে একটি কবিতা পাঠিয়েছিলো। আমি কবিতাটি পড়ে সাথে সাথেই তাকে ম্যাসেঞ্জারে নক দিয়েছিলাম। লোকটি প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমাকে উত্তর দিলো। আমি তাকে আবার নক দিলাম। ম্যাসেঞ্জারে বার্তা চালাচালি করতে থাকলাম।

আমি: স্যার, কেমন আছেন?

লোকটি: ভালো আছি? তুমি?

আমি: ভালো আছি। ম্যাডাম আর আপনার কন্যাদ্বয় কেমন আছেন?

লোকটি: ভালো আছে। ওরা গ্রামে বেড়াতে গিয়েছে।

আমি: খেয়েছেন স্যার? রান্না কে করে?

লোকটি: খেয়েছি। খালা আসে প্রতিদিন। 

 

সেরাতে আমাদের মাঝে অনেক কথা হয়েছিলো - প্রেম কবিতা জীবন – অনেক কিছু নিয়ে। আমার বলতে কোনো আপত্তি নেই যে সে রাতে আমরা মানসিকভাবে অনেক কাছে চলেগিয়েছিলাম। সে রাতে তার কেটে যাওয়া আঙুল দিয়ে ফোনে স্পর্শ করে লিখে চলছিলেন। সারারাতের কথোপকথন শেষে আমিই আমার ফোন নম্বর তাকে দিয়েছিলাম। সেরাতে সে আমাকে গান গেয়ে শুনিয়েছিলো, আমি তার সুরে ডুবে গিয়েছিলাম। আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম তার ঘর-সংসার – সবকিছু জেনেই। আমাকে কাবু করার তার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিলো কি ছিলো না - আমি জানতাম না, কোনোদিন জানতেও চাই নি। 

সেই রাতের সেই আলাপনের পর থেকে আমার জীবন বদলে গিয়েছিলো। এতোদিনে পুরুষের প্রতি আমার যে ধারণা ছিলো – তা বদলাতে শুরু করেছিলো। সারারাতের কথা শেষে ভোর সকালে যখন শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম, আমার ভেতরে দেখতে থাকলাম অন্যরকম এক সুখের জোয়ার বয়ে চলছিলো। শাওয়ারের ঠান্ডা পানিতে এতো শীতলতা অনুভব করতে লাগলাম – যা বৃষ্টির পানিতে ছিলো না। আমার চুল, আমার কপাল, আমার চোখ, গ্রীবা, চিবুক, থুতনি – সব জায়গাতেই একটা জোয়ার দেখতে পেলাম। আমার মনে হচ্ছিলো এরা সবাই এতোদিনে ঘুমিয়ে ছিলো শুধু এই লোকটির অপেক্ষাতে। আমার লাভার নদীতে নাব্যতা আসতে শুরু করলো। ভেতরটা ছটফট করতে থাকে। ভেতরটা ছটফট করতে থাকলো শুধু এই ভেবে যে – ‘এতো জল! তবু কেনো কেউ সাঁতরিয়ে মরে না, আমার পাড় ভেঙে ভেঙে দেয় না!’ আমি গোসল শেষ করে বেডরুমে গেলাম। দেখি লোকটার বার্তা। ভেজাচুলের ফটো চেয়েছিলো। আমি নিঃসংকোচে দিয়ে দিলাম। লোকটিও তার ভেজাচুলের ছবি দিলো। আমি ঘুমোতে গেলাম, হয়তো লোকটিও। 

 

তারপর থেকে লোকটি আমার কাছে আর ড. সিফাত ছিলেন না - সে ছিলো আমার কাছে শুধুই সিফাত; যার সাথে কথা বলা যায়। যাকে কথার যাদুতে কাবু করা যায়, কাবু হওয়া যায়। 

ঘুম থেকে উঠে আমিই তাকে ফোন করেছিলাম। আমি এক নীরব অভিমান ছুড়ে দিয়েছিলাম তার দিকে। আমি হয়তো তখন অবাক হচ্ছিলাম খুব – আমিও অভিমান দেখাতে পারি – এই ভেবে। লোকটি খুব সুন্দরভাবে আমার অভিমান ভাঙিয়ে দিয়েছিলো। আমি আবার তার কথাতে ডুবে গিয়েছিলাম। সেরাতের পরেরদিন আমি শুধুই তার ফেসবুক প্রোফাইল ঘেটে চলছিলাম। লোকটি বেশ সুদর্শন ছিলো। মাথায় লম্বা চুলও ছিলো তার। 

এরপর সন্ধ্যে নামলে সে আমাকে ফোন করে। আমি কথা বলি। ‘আজ আমার প্রোফাইলে কতবার গেছো?’ – লোকটির এমন কথাতে আমি চমকে গেলাম আর মনে মনে ভাবলাম, ‘এতোকিছু লোকটি জানলো কীভাবে?’ আমি ফোন কেটে দিলাম আর রাতের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। 

 

এরপর আবার রাত নেমেছিলো। লোকটি আমার জন্যে একটা গান লিখেছিলো। আমাকে সেই গানটি সে গেয়ে শোনালো। ‘আমাকে নিয়ে কেউ গান লিখতে পারে' – এটা ভেবে নিজেকে অনেক সুখী মনে হতে লাগলো। নিজের অজান্তেই মনের ভেতরে একধরণের হিংসাবোধ জেগে উঠলো। ‘আমি তার কণ্ঠের সুরের ভাগ অন্য কাউকে দিতে চাই না' – এই ভেবে। যাক গে সেসব কথা। আমি আর সে আরও একটি রাত পেলাম। সারা রাত কথার গভীরে হারাতে লাগলাম। লোকটি যে কোনো ধান্দাবাজ ছিলেন না – তা আমি তার সরল স্বীকারোক্তিতেই বুঝতে পেরেছিলাম। সেরাতে আমার ব্যক্তিগত জীবনের সব তথ্য তাকে বলেছিলাম। সেও কিছু কিছু বলেছিলো। সে যখন স্পর্শী বলে আমাকে ডাকতো, তখন আমার ভেতরে অন্যরকম সুখ লাগতো। আমার বাবা-মা, ভাই-বোন অনেকেই আমার নাম ধরে ডাকতো। তবে সিফাতের মুখের ডাকের সাথে যে মধুরতা পেয়েছিলাম তা কোথাও আমি পাই নি, এখনো পাই না। 

 

সেসময় আমার দিন ভালো লাগতো না। আমি শুধু রাতের জন্যে অপেক্ষা করতাম। তার কথা আর সুরের জন্যে আমার অপেক্ষা বাড়তো। আর রাতভর কথার শেষে আমি শাওয়ারের নিচে দাঁড়ানোর জন্যে অপেক্ষায় পাগল হতে থাকতাম। যাক গে ওসব কথা। সেদিন রাতের কথার শেষে যখন ঘুমোতে গেলাম, ঘুমের মধ্যেই সিফাত আমাকে বার্তা দিলো – ‘তোমার ভাবী বাসায় ফিরে এসেছে। আমি নক না দিলে তুমি নক দিও না যেনো।’ সিফাতের এমন কথা শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। সেসকালে আমার আর ঘুম আসেনি। আমার মনের ভেতরে খরস্রোতা বয়ে চলছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি মনে হয় চৈত্রের শুকিয়ে পড়া নদী – যেখানে মাঝি আসা বারণ রয়েছে, বারণ রয়েছে সিফাতের কথা আর সুর আসার। 

 

তারপর লোকটি আমাকে গোপনে গোপনে ফোন করতো; সন্ধ্যে বেলায় বের হলেই মনে হয় প্রথম ফোনটি আমাকে করতো। আর আমি মনে হয় এই ফোন কলের জন্যেই সারাদিন বসে থাকতাম, পাগল হয়ে থাকতাম। আমি শুধু রাতের জন্যে অপেক্ষা করতাম, ঠিক আগের দুই রাতের জন্যে – যে রাত ছিলো একান্তই সিফাতের আর আমার। 

লোকটি ছিলো পুরোপুরি ভীতুর ডিম। চার দেওয়ালের বাইরে বের হওয়ার সাধ্য তার ছিলো না। মৌলি আপা মনে হয় তাকে সারাদিনই বেঁধে রাখতো। তখন আমার মনে হতো আমি সবকিছু ছেড়ে তার কাছে চলে যাই নতুবা তাকে নিয়ে আসি আমার কাছে। লোকটিও অনেক পাগলামি করতে থাকতো। ‘সময়ের উপরে ছেড়ে দিই, একদিন সবকিছু হয়তো মিলে যাবে' – এইসব বলেই সিফাতকে আমি সান্ত্বনা দিতাম। আর লোক জানাজানি হলে সিফাতের উপরে হয়তো বিপদ আসতে পারে – এইসব ভেবে আমার খুব চিন্তা হতো। 

 

‘তোমার মৌলি আপা সব জেনে গেছে। কীভাবে জেনে গেছে তা আমি জানি না' – সিফাতের এমন কথাতে আমার কান্নায় বুক ফেঁটে যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেলো। সিফাতের মতো ভীরুর পক্ষে কোনোদিনও সম্ভব ছিলো না দু’কূল বেয়ে চলা।

এরপর থেকে আমি সিফাতের স্ত্রী মৌলি আপা সম্পর্কে খবর নিতে থাকি। মৌলি আপা আর সিফাতের সম্পর্ক খুব গাঢ় ছিলো। প্রেম করেই তাদের প্রণয়ে আবদ্ধ হয়েছিলো। এমনকি সিফাত যে আজ ড. সিফাত হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে – তার পেছনে মৌলি আপার অনেক অবদান রয়েছে। মৌলি আপার জন্যে আমার খুব মায়া লাগতে থাকে। আমার বহুবার ইচ্ছে হয়েছে তার সামনে গিয়ে কথা বলতে। আমি যেতে পারি নি। ফিরে ফিরে এসেছি অপরাধীর মতো। 

 

একদিন ভোর বেলা ঘুম ভাঙতেই দেখি সিফাত আমাদের বাসায় এসে হাজির। তার চোখে-মুখে আঁচড়ের দাগ। রক্ত ফেটেঁ ফেটেঁ রয়েছে, শুকিয়ে চলটা পড়ে গেছে। আমি তাকে আমার রুমে নিয়ে গেলাম। হাত-মুখ ধুতে বললাম। আমার বাবা-মা কিছুই জানতো সিফাত আর আমার সম্পর্কের ব্যাপারে। সিফাতকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমি আর সিফাত বাসা থেকে বের হলাম। সারাদিনের বাস জার্নি শেষে আমরা একটা কটেজে উঠলাম। আপাতত সেটাও ছিলো আমাদের নিরাপদ গন্তব্য। এরপর কোথায় যাবো, কী হবে – সেসবের কিছুই তখন আর ভাবছিলাম না। ‘মৌলি আমাকে গুনে গুনে বারোটা থাপ্পড় মেরেছে। নাক-মুখ খামছে দিয়েছে।' – সিফাত এটা বলতেই আমার কষ্ট জাগতে থাকে আর মৌলি আপার উপর রাগ বাড়তে থাকে। একসময় আমি নিজেকে মৌলি আপার জায়গায় বসালাম। তখন মনে হলো মৌলি আপা হয়তো ঠিকই করেছিলো। আমি হলেও হয়তো এমনটি করতাম। 

কটেজেই রাতের খাবারের ব্যবস্থা ছিলো। খাওয়া শেষে আমি আর সিফাত চা পান করছিলাম। সিফাতের চোখেমুখে ঘুম ছিলো আর আমি ছিলাম নির্ঘুম। ‘মৌলি আপু মনে হয় ঠিকই করেছে। সে এটা না করলে তুমি কী আমার কাছে আসতে?’ – আমি এটা বলতেই সিফাত বেড়াল থেকে বাঘের মতো হয়ে গেল। আমি হাসতে লাগলাম। সিফাত সব ক্ষতের দাগ ভুলে গিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি পাগল হতে লাগলাম, সে আমাকে পাগল করতে লাগলো। সে রাত ছিলো শুধু আমাদের; ভেঙে পড়ার আর জেগে ওঠার। আমি সিফাতকে জাগিয়ে তুলছিলাম, সিফাত আমার লাভার নদীর গভীরে নাও বেয়ে চলছিলো। আমি সুখ পাচ্ছিলাম, হয়তো সেও। রাত শেষ হলো। আমার শরীরটা ব্যথা হয়ে গিয়েছিলো। সিফাতের কোনো ব্যথা ছিলো না। আর এই জায়তাতেই মনে হয় সিফাতরা আমাদের থেকে এগিয়ে থাকতো। 

রাত শেষ হলে আবার আমরা বাড়িতে ফিরে আসলাম। সিফাতকে খেতে দিয়ে বিদায় করলাম। সিফাত কোথায় যাবে – তা আমি জানতাম না। তবে বিবাহিত পুরুষ তো – ঘুরে ফিরে চার দেওয়ালেই যাবে – আর সিফাত সেখানেই গিয়েছিলো। 

 

সিফাতকে বাড়ি থেকে বিদায় দিয়ে আমি আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। ‘আমি কি অপরাধ করেছি? আমার শরীরে কি কোনো দাগ লেগেছে? ঐ যে ঐ দাগ যেটাকে লোকে কলঙের দাগ বলে।’ – আমি এইগুলোই ভাবতে থাকলাম কিছুক্ষণ। এরপর বাবার দিকে তাকালাম, মায়ের দিকে তাকালাম। নিজেকে কিছু সময়ের জন্যে অপরাধী মনে হলো। 

সিফাত ঘরে ফিরে গিয়েছিলো। হয়তো ওর উপর দিয়ে টর্চার সেল বয়ে চলছিলো। মৌলি আপা হয়তো ওর শরীরে লংকা পেঁয়াজ বেটে চলছিলো। সিফাতের জন্যে আমার মনে ব্যথা জাগতে থাকে। আমি সিফাতকে ফোন করি। সিফাত বলেছিলো সব ঠিক ছিলো। 

ঐ ঘটনার তিনদিন পরে আমার বাড়িতে একটা চিঠি আসে। আমার একটা জব হয়। একটা প্রাইভেট ব্যাংকে। একমাস পরে জয়েনিং ছিলো। চিঠিটি নিয়ে যখন বাবাকে দেখাতে লাগলাম, তখন আমার তলপেটে ব্যথা বাড়তে থাকে। আমি বাথরুমে গিয়ে বমি করলাম যা ছিলো একটু আলাদা। আমি একটু একটু করে অসুস্থ হতে থাকি। মাকে বলতেই মার মুখে চিন্তার ভাঁজ দেখি। বাবাকে বলতে পারলাম না সেসময়। সিফাতকে ফোন করলাম। সিফাত আসলো। আমি সিফাতকে কোনো দোষ দিতে পারি নি। নিজেকে দায়ী করি নি। আমি সিফাতকে বলেছিলাম, ‘কে যেনো আমার ভেতরে বেড়ে উঠছে?’ সিফাতের মুখে বিজয়ের হাসি ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমার তলপেট ঝুলিয়ে ও বড় সুখ পেয়েছিলো। সিফাত চলে গেলো। 

 

এর সাতদিন পরে সে আবার বাসায় আসলো। সিফাতের বড় মেয়ে তৃণার জন্মদিন ছিলো। আমার জন্যে কেক আর খাবার নিয়ে এসেছিলো। আমি খাবার খেতে পারলাম না। আমার ভেতরেরটা কিছু খেতে দিচ্ছিলো না। ‘তৃণাকে বলো ওর ছোট মা অনেক উইশ! করেছে' – একথা বলে সিফাতকে বিদায় দিলাম। তৃণার প্রতি আমার কোনো রাগ ছিলো না, ফুলের মতো মেয়ে – রাগ করার উপায় ছিলো না। 

এরপর প্রায় আমার চাকরীতে যোগদানের সময় চলে আসলো। সিফাতের প্রতি আমার রাগ জাগতে শুরু করে। সিফাত কেনো আমাদের কাজের মেয়ে হাসিয়ারার বরের মতো হতে পারে না? হাসিয়ারার বরের নাকি তিন বউ আছে। আমাকে কেনো সে স্বীকৃতি দিতে পারে না? সিফাত কেনো আমাদের কাজের ছেলে আনোয়ারের মতো হতে পারে না? আনোয়ারের নাকি দুই বউ রয়েছে। সিফাত কেনো এতো ভয় পায়; সমাজের, সংসারের মৌলি আপার? এইসব চিন্তা আমাকে কুরে কুরে খেতে থাকে। 

 

আচ্ছা মৌলি আপার সাথে সিফাতের বিচ্ছেদ হলেই কি সিফাত আর আমার সংসার হবে? অনেকেই তো চুক্তিতে থেকে কত নি:সঙ্গ থাকে, কেউ কারোর খবর রাখে না। আমার মেজো খালার সাথে খালুর কোনো মানসিক যোগাযোগ আমি দেখি না। দেখি শুধু দু'জনের বন্দী দশা। শুধু মেজো খালা কেনো – সমাজে এমন কতো আছে যারা একসাথে থেকেও কেউ কারোর মানসিক টানে নেই। 

আমি সিফাতকে বন্ধনে বাঁধতে চাই না, বেঁধে রাখতে চাই না। শুধু বলেছি আমার তলপেটে ভারী হওয়ার আগেই স্বীকৃতি দিতে। সমাজ বলে তো কিছু আছে! যদিও তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যে আসবে সে  কালিমার দাগ বয়ে বেড়াবে কেন? সিফাত আমার কথা রেখেছিলো। আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো। 

এখন আমার একটা সন্তান আছে। ওর নাম আরাধ্য। ওকে নিয়েই আমি আছি। চাকরী করি, কবিতা লিখি গল্প লিখি। বাবা- মা এখনো জীবিত আছেন। তাদেরকে সময় দেই। ভালোই তো আছি। নিজেকে কখনোই নি:সঙ্গ মনে হয় না আমার কাছে। 

 

শুনেছি মৌলি আপু আর সিফাত আলাদা হয়ে গেছে আরাধ্যের জন্মের পরে। তৃণা আর তিতলীকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে। ওরা মনে হয় এখন স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। 

সিফাত আর মৌলি যে আলাদা হয়েছে তার জন্যে কি আমি অপরাধী? সিফাত কি অপরাধী? না। না সিফাতের দোষ ছিলো না আমার। হয়তো দু'জনেরই দোষ ছিলো। তবে সবথেকে নিরপরাধ ছিলো মৌলি আপা। মৌলি আপুর জন্যে আমার খারাপ লাগে খুব। হয়তো তার চোখে আমি অপরাধী। সিফাত হয়তো আরও বেশি। 

এখন সিফাত সিফাতের মতো থাকে। মাঝে মাঝে আরাধ্যকে দেখতে আসে। আমি তার আসা বন্ধ করতে পারি না। মৌলি আপু আর কোনো সম্পর্কে জড়িয়েছে কি না – আমি জানি না। সিফাতের এমন নি:সঙ্গতা দরকার ছিলো। ওর কাছে নাকি সঙ্গ বেড়ার মতো লাগতো। আমারও সঙ্গত ভালো লাগে না। মানুষ হয়ে যতোটুকু না হলেই নয়, সেটা হলেই চলে। মৌলি আপুর সঙ্গ ভালো লাগতো। আর তাই হয়তো সিফাত আর তার সন্তানদের নিয়ে আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলো। সেটা আর হয় নি। মৌলি আপাও এখন চাকরী করে।

 

আমি আরাধ্যকে নিয়েই বেঁচে আছি। আমার একটা পৃথিবী আছে। নিজেকে কখনোই খুব বেশি নি:সঙ্গ মনে হয় নি। সিফাতের সাথে চার দেওয়ালে থাকলেই কি সঙ্গে থাকতাম আমি? এসব নিয়ে ভাবতে চাই না। তবে তথাকথিত সমাজের চোখে আমি হয়তো খুব নি:সঙ্গ, সিফাত নি:সঙ্গ, মৌলি আপাও নি:সঙ্গ। তাই সমাজের চোখে আমরা সবাই নি:সঙ্গ। সেক্ষেত্রে ‘যেখানে সবাই নি:সঙ্গ' নাম দিয়েই গল্পটি শেষ করা যেতে পারে।

 

 আসিফ ইকবাল আরিফ

শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ। 


মো. ফাহাদ বিন সাঈদ, জাককানইবি প্রতিনিধি ১৭-১০-২০২০ ১১:২৪ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 218 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার (তৃতীয় তলা),
বেগম রোকেয়া স্মরনী, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   [email protected]