নারী দিবস কেবলি বেগুনি সাজের আফসোস?
২০ এপ্রিল, ২০২১ ১১:১৪ অপরাহ্ন

  

নারী দিবস কেবলি বেগুনি সাজের আফসোস?

নিউজরুম এডিটর
০৮-০৩-২০২১ ০২:৫৫ অপরাহ্ন
নারী দিবস কেবলি বেগুনি সাজের আফসোস?

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘নারী’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ কবিতাটি তিনি শেষ করেছিলেন এভাবে, ‘সেদিন সুদূর নয়, যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!’ কিন্তু সে ‘সুদূর নয়’ যে আসলে কত দূর, তা আজও আমাদের অজানা। আজও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, স্বীকৃতিবিহীন নারীর শ্রম, পারিবারিক সহিংসতা, অর্থ-সম্পত্তির ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণহীনতার বিষয়গুলো নারীর ক্ষমতায়িত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত ব্যাহত করে চলেছে।

প্রতিবছর ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস।। দিবসটি পালনের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে উচ্চারিত হয় নারী-পুরুষ সমতা এবং নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসনের প্রত্যয়। নারী এগিয়ে যাচ্ছে, একথা যেমন ঠিক, তেমনি প্রযুক্তির এ যুগে এসেও অনেক নারীকে পরনির্ভরশীল জীবনযাপন করতে হচ্ছে, এটাও ঠিক। আমাদের চারপাশে বহু নারী রয়েছেন, যারা নিজের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন। নারীর উন্নয়ন আর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আবার এর বিপরীত চিত্রও আছে। কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে নারীর আত্মবিশ্বাসের অভাব ‘আমি নারী তাই এ কাজ আমার দ্বারা হবে না।’ এ ধরনের মানসিকতা নারীকে পিছিয়ে দেয়, যদিও আজকাল এ মানসিকতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

প্রতিবছর বিভিন্ন প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বিশ্বে নারী দিবস পালিত হয়। প্রতিপাদ্যগুলোর মূল কথা থাকে নারীর প্রতি সামাজিক বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন দূর করা। সেই সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয় নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আর নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিতে। কিন্তু আজও আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি। আমরা নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি রাস্তায়, গণপরিবহনে, এমনকি উন্মুক্ত স্থানেও। গণপরিবহনে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে অহরহ। অ্যাকশনএইডের উদ্যোগে বিশ্বের ১০টি শহরের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৪৯ শতাংশ নারী গণপরিবহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

নারী দিবসের পটভূমি ব্যাপক। এটি একটি দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। মালিকদের অমানবিক আচরণের কারণে ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সুতা কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকরা সড়কে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। বেতনবৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা আর কাজের বৈরী পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নারী শ্রমিকরা একজোট হলে তাদের ওপর কারখানা মালিকেরা আর তাদের মদতপুষ্ট প্রশাসন দমন-পীড়ন চালায়। প্রায় ৫০ বছর পর ১৯০৮ সালে জার্মানিতে এই দিনটির স্মরণে প্রথম নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। এ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১০০ নারী প্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলেন। এ সম্মেলনেই প্রথমবারের মতো জার্মানির নারী নেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ১৯১৪ সাল থেকে কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানানোর পর থেকে বিশ্বব্যাপী এর তাৎপর্য তুলে ধরার মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

নারী দিবসের রং নির্ধারিত হয়েছে বেগুনি ও সাদা, যা নারী অধিকারের প্রতীক। বেগুনি ও সাদা রং সুবিচার ও মর্যাদা নির্দেশ করে। ১৯৮৩ সালে পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ লেখক ও নারীবাদী অ্যালিস ওয়াকারের প্রশংসিত উপন্যাস ‘দ্য কালার পারপল’ বইটি এই রং নির্ধারণে অনুপ্রেরণা জোগায়। এ বইতে তিনি নারীদের অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন। ধারণা করা হয়, সেখান থেকেই নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে গেছে বেগুনি-সাদা রং।
৮ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ সারা বিশ্বে অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়ে আসছে, যার সংক্ষিপ্ত রূপ ‘আইডব্লিউডি’। এর আদি নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস। আমাদের দেশের গার্মেন্টস সেক্টরের ৮০ ভাগ শ্রমিক নারী । গৃহিনী নারীরা কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় বেশি কাজ করে, যা এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে। আবার কর্মজীবী নারী ঘরে বাইরে সমতালে কাজ করে। এত কিছুর পরেও পরিবার সমাজে সাধারণ নারীদের হেয় হতে হয়। তাদের প্রাপ্য মর্যাদাটুকু পাওয়ার পরিবর্তে মিলে নিরাপত্তাহীন জীবন। যার প্রমাণ মিলে খবরের পাতায় নির্যাতিত নারীদের খবরে। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক সময়ে সমাজের একটা অবস্থানে বসে যখন নারীর ক্ষমতায়ন দিয়ে নারীকে যাচাই করে তখন সেখানে থাকে শ্রেণি বৈষম্যতার দৃষ্টিভঙ্গি। প্রাচুর্যময় পরিবেশে থেকে বস্তির নারীর অধিকারের বাস্তব নির্মমতা বুঝা যায় না। অফিসের একজন অধস্তন নারী কর্মচারী বিপাকে পড়ে ও চুপ থাকার কারণ উপলব্ধি করতে পারে না সমাজের উঁচু আসনের পুরুষ বা নারী ব্যক্তিটি। কারণ 'ছা পোষা' নারীটি চাকরি হারালে ঘরের সন্তান অভুক্ত থাকবে। আর পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির বিচারের আগে 'নারীই খারাপ' এ সীলটা দিতে মুখর থাকে সমাজ।

তবে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও নারীর অধিকারের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক শতাব্দীরও আগে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, সে স্বপ্নের পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল। বর্তমান সরকার দেশের নারীসমাজের সার্বিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগের ১০টি কর্মসূচির মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন একটি। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডারসমতা নির্ধারণে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারীর সামর্থ্য উন্নীতকরণ, নারীর অর্থনৈতিক প্রাপ্তি বৃদ্ধিকরণ, নারীর মতপ্রকাশের মাধ্যম সম্প্রসারণ এবং নারী উন্নয়নে সার্বিক পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আমাদের নারীসমাজ লিঙ্গবৈষম্যের শেকড় ছিঁড়ে মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার অবকাশ পেয়েছে। এদেশের নারীরা আজ রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইন-বিচার, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিসহ সব ক্ষেত্রেই পুরুষের পাশাপাশি সমান গৌরবের অধিকারী। এটা সম্ভব হয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে।

কোথায় নেই নারীর পদচারণ! যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সব আন্দোলন-সংগ্রামে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। নারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করছেন। কূটনৈতিক ও শান্তি মিশনেও এদেশের নারীরা সমানভাবে সক্রিয়। বিশ্বের অনেক বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তারা। ক্রীড়াক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন তারা। সাংবাদিকতার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তারা করছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নিজের চেষ্টায় সফল নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ সব কিছুর পেছনে পুরুষদের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য।তাদের সহযোগিতা পরিলক্ষিত হয় এক্ষেত্রে।

বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নারীর প্রতি পুরুষদের ধারণা অনেকটাই পাল্টে গেছে। দেশের অগ্রগতিতে নারীর অবদান রয়েছে। পুরুষের সহযোগিতাও কোনোভাবেই খাটো করে দেখার নয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সুফল প্রতিটি নারীর কাছে পৌঁছাতে হলে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত উদ্যোগ খুবই জরুরি। আর শুধু তখনই কেবল আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত করতে পারব।

নারী ও মানুষ। সুতরাং নারী দিবস পালন না করে মানুষ হিসাবে নিজেকে নতুন করে ভাবার কোন কারণ নাই। বরং মেধা মননে প্রজ্ঞাবান নারীরা বেগুনি সাজে আয়নাতে দাঁড়িয়ে নিজের জায়গায় সাধারণ নারীকে দেখুন। তবে আজ যে সমতার কথা বলা হচ্ছে তার গভীরে যাওয়া সম্ভব হবে।

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।

 


নিউজরুম এডিটর ০৮-০৩-২০২১ ০২:৫৫ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 50 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার (তৃতীয় তলা),
বেগম রোকেয়া স্মরনী, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   [email protected]